নিজেস্ব প্রতিবেদক:
যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর-বালিয়াডাঙ্গা ও মান্দারতলা এলাকায় আবাসিক ভবনে খোলা মবিল সংগ্রহ করে বিভিন্ন নামে প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, যশোরের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঝুমঝুমপুর-বালিয়াডাঙ্গা এলাকায় নায়েব ফারুকের বাড়ির পাশে একটি তিনতলা ভবনের নিচতলায় ‘আর জে এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে লুজ মবিল এনে প্যাকেটজাত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রোপ্রাইটর হিসেবে সিহাব হোসেন, পিতা বাবুল হোসেন-এর নাম জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, খোলা বাজার থেকে লুজ মবিল সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন বোতল ও প্যাকেটে ভরে **‘সুপার স্পোর্টস লুব্রিকেন্ট’ ও ‘ইঞ্জিন অয়েল ফোরটি’**সহ বিভিন্ন নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন নাম ও বেনামে এসব পণ্য যশোরের বিভিন্ন এলাকায় পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
‘লুজ মবিল কিনে প্যাকেট করে বাজারজাত করি’
অভিযোগের বিষয়ে আর জে এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর সিহাব হোসেন জানান, তিনি যশোর শহরের মনিহারের পাশে জিসান এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মো. রহিমের কাছ থেকে মবিল সংগ্রহ করে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করেন।
তবে পণ্য প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় BSTI লাইসেন্স, মান সনদ, মোড়কজাতকরণ নিবন্ধন ও পরিবেশগত অনুমোদন রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের বিষয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর: অভিযোগ পেয়েছি, তথ্য পেলে ব্যবস্থা
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, যশোরের সহকারী পরিচালক বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কারখানা পরিচালনা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এসব কারখানা থেকে সৃষ্ট দূষণের কারণে মানুষের ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, চর্মরোগসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের দূষণের মধ্যে বসবাস করলে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।”
তিনি আরও জানান, যশোরে এ ধরনের ভেজাল মবিলের কারখানার বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানাও করা হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রমের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা: তথ্য পেলে দ্রুত ব্যবস্থা
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার হক জানান, “এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ভেজাল মবিল যেমন গাড়ির ইঞ্জিনের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ধরনের কার্যক্রমের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আমরা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
তিনি আরও বলেন, আবাসিক এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে কোনো ধরনের ক্ষতিকর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেটিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।
আগেও অভিযান, জেল-জরিমানার পরও অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, যশোরে এর আগেও ভ্রাম্যমাণ আদালত, র্যাব, পুলিশসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্থা বিভিন্ন সময় মবিলের অনুমোদনহীন উৎপাদন, প্যাকেটজাতকরণ ও বাজারজাতের অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে জেল-জরিমানাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের দাবি, একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনার পর অন্যত্র স্থান পরিবর্তন করে একই ধরনের কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ফলে শুধু কারখানায় অভিযান না চালিয়ে এর পেছনে থাকা সরবরাহকারী ও বাজারজাতকারী চক্রকে শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
‘ব্যাঙের ছাতার মতো’ গড়ে উঠছে
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, যশোরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট পরিসরে এ ধরনের মবিল প্যাকেটজাত করার কার্যক্রম ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, বাজার থেকে লুজ মবিল কিনে বিভিন্ন নামে বা বেনামে প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রানা বলেন, “এভাবে খোলা মবিল এনে প্যাকেট করে বিক্রি করা সঠিক কি না, সেটি কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা উচিত। মবিলের মান খারাপ হলে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।”
প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ার অভিযোগ
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, যশোরে লুজ মবিল সংগ্রহ, প্যাকেটজাত ও বাজারজাতের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জড়িত। তাদের দাবি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় সহজে বন্ধ হচ্ছে না।
গোপন সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিমাসে প্রায় ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মাসোহারা নিয়ে থাকে। এসব অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে সিন্ডিকেটটি পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গোপন সূত্রের আরও দাবি, প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদনের সময় কোনো নথি বা আর্থিক লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এমনকি পুলিশ, প্রশাসন ও সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ, প্রশাসন ও সাংবাদিকদের বক্তব্য এ বিষয়ে পাওয়া যায়নি।
বাড়ি-গোডাউন ভাড়া নিয়ে কার্যক্রমের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসিক এলাকার বিভিন্ন বাড়ি, গোডাউন বা ভবনের নিচতলা ভাড়া নিয়ে কিংবা নিজেদের গোপন স্থানে লুজ মবিল প্যাকেটজাত করার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে হামিদপুর, বাউলিয়া, মান্দারতলা, ঢাকা রোড, হুশতলা, বকচর, রাজারহাটসহ যশোরের বিভিন্ন এলাকা। তবে এসব এলাকার প্রতিটি স্থানে এমন কার্যক্রম চলছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের দাবি, আবাসিক এলাকায় তেলজাতীয় পদার্থ সংরক্ষণ ও প্যাকেটজাত করার কারণে পরিবেশ দূষণ, অগ্নিঝুঁকি এবং জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ক্ষতি তৈরি হতে পারে।
BSTI অনুমোদন ও পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, আর জে এন্টারপ্রাইজে মবিল প্যাকেটজাত ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় BSTI অনুমোদন, মান সনদ, মোড়কজাতকরণ নিবন্ধন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র, পণ্যের মান, প্যাকেটের লেবেল, মবিলের উৎস এবং প্যাকেটজাতকরণের প্রক্রিয়া যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
পুরো চক্র তদন্তের দাবি
এলাকাবাসীর দাবি, BSTI, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করে এসব প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করুক।
একই সঙ্গে লুজ মবিলের সরবরাহকারী, প্যাকেটজাতকারী, পরিবেশক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের নিয়ে পুরো চক্রের উৎস অনুসন্ধান করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, কোনো প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এর পেছনে কোনো সিন্ডিকেট, অবৈধ অর্থ আদায় কিংবা প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা শনাক্ত করা হোক।
প্রতিবেদনে ‘ভেজাল মবিল’, সিন্ডিকেট, মাসোহারা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ার বিষয়গুলো অভিযোগ ও গোপন সূত্রের তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পণ্য ভেজাল কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নমুনা পরীক্ষা ও নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান, পুলিশ, প্রশাসন, BSTI ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
যশোর জার্নাল
প্রকাশক ও সম্পাদক: মোঃ আসিফ আকবর সেতু।
মোবাইলঃ +৮৮ ০৯৬৯৬০৭০৩৯১
Gmail: jashorejournal@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত