
নিজেস্ব প্রতিবেদক:
ভবদহের জলাবদ্ধতায় বছরের পর বছর ফসল ফলানো যেত না। বিস্তীর্ণ জমি পড়ে থাকত পানির নিচে। জমির মালিকদের কাছে এসব জমি হয়ে উঠেছিল এক ধরনের বোঝা। সেই পতিত জমিই লিজ নিয়ে মাছের ঘের তৈরি করে নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি জমির মালিকদের জন্যও আয়ের নতুন পথ তৈরি করেছেন যশোরের মণিরামপুরের সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী এম এ হালিম। ২০০৭ সালে শুরু করা তাঁর সেই উদ্যোগ এখন প্রায় দুই দশক ধরে জলাবদ্ধতাকবলিত এলাকায় কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
মণিরামপুরের ভবদহ তীরবর্তী এলাকার মানুষের কাছে জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বিল কপালিয়া, বিল খুকশিয়া, বিল আড়পাতা, বিল কেদারিয়াসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার জমিতে নিয়মিত ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়ে আসছে। বছরের পর বছর জমি পানিতে তলিয়ে থাকায় কৃষিনির্ভর বহু পরিবার পড়েছিল চরম অনিশ্চয়তায়। সেই বাস্তবতায় বিকল্প ব্যবহারের পথ খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেন এম এ হালিম।
২০০৭ সালের শুরুর দিকে ভবদহ তীরবর্তী খানপুর ও কুলটিয়া ইউনিয়নের বিল শালিকার পতিত জমির মালিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব ছিল—জলাবদ্ধতার কারণে যেসব জমিতে ফসল হচ্ছে না, সেসব জমি লিজ নিয়ে সেখানে মাছের খামার করা হবে। জমির মালিকদের সম্মতিতে নির্দিষ্ট হারে লিজ নিয়ে ডিট তৈরি করে শুরু করেন বাণিজ্যিক মৎস্য চাষ।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এম এ হালিমকে। দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য চাষ করে তিনি নিজে যেমন সফল হয়েছেন, তেমনি তাঁর নেওয়া লিজের কারণে উপকৃত হয়েছেন জমির মালিকরাও। যে জমি থেকে ফসল পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন তাঁরা, সেই জমি থেকেই এখন নিয়মিত লিজের টাকা পাচ্ছেন। ফলে পতিত জমি তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে পরিবারের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষক মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে পতিত জমিকে লিজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য খামারে পরিণত করার ক্ষেত্রে এম এ হালিমের উদ্যোগটি স্থানীয়ভাবে আলাদা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। একসময় যে জমি ছিল ফসলহীন, যে জল ছিল দুর্ভোগের প্রতীক—সেই জমি ও জলকেই কাজে লাগিয়ে নিজের এবং অন্যের জীবনে পরিবর্তনের গল্প লিখেছেন এম এ হালিম। তাঁর উদ্যোগ দেখিয়েছে, সব সংকটের সমাধান হয়তো সংকট দূর হওয়ার অপেক্ষায় নয়; কখনো কখনো সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনা খুঁজে নেওয়ার সাহসই বদলে দিতে পারে মানুষের ভাগ্য।
জমির মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন তাঁদের জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব হয়নি। এম এ হালিম জমি লিজ নেওয়ার পর সেই জমি থেকে নিয়মিত আয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, “যে জমি একসময় কোনো কাজে আসত না, সেই জমিই এখন পরিবারের খরচ চালানোর অন্যতম ভরসা।”
এম এ হালিম বলেন, “জলাবদ্ধতার কারণে বছরের পর বছর জমি পড়ে থাকলে কৃষকের যেমন ক্ষতি, দেশেরও তেমনি ক্ষতি। তাই পতিত জমিকে মৎস্য চাষের আওতায় এনে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি জমির মালিকরাও উপকৃত হচ্ছেন—এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ সিরাজুল ইসলাম বলেন, এম এ হালিমের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় দিক হলো—তিনি জলাবদ্ধতার কারণে অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়া জমিকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর লিজ নেওয়া জমিতে মাছ চাষের ফলে একদিকে জমির মালিকরা আয় পাচ্ছেন, অন্যদিকে মৎস্য খামারকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা সম্প্রতি এম এ হালিমের মৎস্য খামার পরিদর্শন করে উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তাঁর মূল্যায়নে, জলাবদ্ধ এলাকার অনাবাদি জমিকে পরিকল্পিতভাবে মৎস্য চাষে ব্যবহার করা গেলে তা স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সম্রাট হোসেন বলেন, “মণিরামপুরের মৎস্য সম্পদ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। আত্মকর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতা সৃষ্টিতে মাছ চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারের নানা উদ্যোগে এ খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।